আশীষ কুমার সেন
বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, ২০০৫ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা (International Hydrographic Organization) এর ১০০ সদস্য রাষ্ট্রই এই দিবসটি পালন করে থাকে। বাংলাদেশ যেহেতু নদীমাতৃক দেশ এবং নদীপথ ও নদী তীরবর্তী যেকোনো উন্নয়নের সাথে হাইড্রোগ্রাফিক সমীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে, সেহেতু নদী ব্যবহারকারী সকলের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিআইডব্লিউটিএ প্রতিবছর যথাযথ গুরুত্বসহকারে দিবসটি পালন করে আসছে। এ দিবসটি পালনের আরও কয়েকটি মুখ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে হাইড্রোগ্রাফির গুরুত্ব প্রচার, হাইড্রোগ্রাফিক উপাত্ত বিনিময়ে বহুপাক্ষিক ও কার্যকর সহযোগিতা প্রদান, হাইড্রোগ্রাফিক চার্টের মান উন্নয়ন ইত্যাদি। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে Hydrographic Information-Enhancing Safety, Efficiency and Sustainability in Marine Activities.
তিনি আরও বলেন, এ ভূখণ্ডে জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদী। এ অঞ্চলের পরিবহনব্যবস্থার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম নদীপথ। এই নদীপথ রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৫৮ সালের ৩১ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ১৯৫৮’ জারির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা EPIWTA এর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে বিআইডব্লিউটিএ প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পর হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ও সামগ্রিক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের প্রয়োজনীতা দেখা দেয়। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐকান্তিক ইচ্ছায় সারা দেশব্যাপী নদী খনন ও নৌ-পথের উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলে কর্তৃপক্ষ একটি শক্তিশালী হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং ১৯৭৩ সালে হাইড্রোগ্রাফি শাখাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ হিসেবে উন্নীত করা হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুরুর দিকে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ বেইজলাইন নির্ণয়পূর্বক সেক্সটেন্ট (ট্রাইএ্যাংগুলেশন) ও লিডলাইন ব্যবহার করে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ কাজ পরিচালনা করতো। সময়ের সাথে সাথে জরিপ যন্ত্রপাতির আধুনিকায়নের ফলে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পদ্ধতিরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৬৬ সালে জরিপকালীন অবস্থান নির্ণয়ের জন্য কর্তৃপক্ষ ইলেকট্রনিক পজিশন ফিক্সিং সিস্টেম হিসেবে Decca Chain System স্থাপন করেন। ২০০০ সালে পূর্বতন Decca Chain System পদ্ধতির পরিবর্তন করে স্যাটেলাইট ভিত্তিক আধুনিক ও ডিজিটাল অবস্থান নির্ণয় পদ্ধতি হিসেবে Differential Global Positioning System (DGPS) স্থাপন করা হয়।
তিনি জানান, হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ ২০১১ সাল থেকে অদ্যাবধি বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ও সফট্ওয়ার ব্যাবহার করে ডিজিটাল হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ সম্পাদন ও পরিচ্ছন্ন চার্ট প্রণয়ন করছে।
অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌ-পথের হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট প্রকাশ, নদী তীরবর্তী স্থাপনাদি নির্মাণ ও ব্রিজ নির্মাণ সংক্রান্ত অনুমোদন, বালুমহাল ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট প্রকাশ, ৫৪টি ডিজিটাল রাডার টাইপ গেজের মাধ্যমে জোয়ার-ভাটার তথ্য সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াকরণ করে টাইড টেবিল প্রকাশ, ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুটসহ সমস্ত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীপথের চার্ট প্রকাশ এবং নৌ-পথে ডুবে যাওয়া জাহাজসহ অন্যান্য বস্তু অবস্থান নির্ণয়সহ উদ্ধার কার্যক্রমে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বিআইডব্লিউটিসি’র ডুবে যাওয়া ফেরি ‘রজনীগন্ধা-৭’ উদ্ধার কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ ফেরিতে বহনকারী ডুবে যাওয়া ৬টি ট্রাকের অবস্থান মাল্টিবিম ইকোসাউন্ডার ব্যবহার করে দক্ষতার সাথে নির্ণয় করে এবং বিআইডব্লিউটিএ উদ্ধার কার্যক্রমকে ১০০ ভাগ সফল করে।
তিনি অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, রুপকল্প ২০২১ (ডিজিটাল বাংলাদেশ) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কর্তৃপক্ষের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ ডিজিটাল হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট প্রকাশ, আনুভূমিক ও উলম্ব ছাড়, রিয়েলটাইম টাইডাল ডাটা প্রদর্শন ও অনলাইন ডাটা বিক্রয় সংক্রান্ত ই-সেবা প্রদান করছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে বিআইডব্লিউটিএ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
উল্লেখযোগ্য উদ্যোগসমূহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গেজ স্টেশন সংখ্যা বৃদ্ধিকরণ, ENC (Electronic Nautical Chart) ও AIS ( Automatic Identification System) ইত্যাদি। বিআইডব্লিউটিএ’র সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রমকে আরো বেগবান করার লক্ষ্যে দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
